জনস্বাস্থ্য খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ ডা. লি জং-উক স্মারক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কিংবদন্তি চিকিৎসক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল ফায়েজ। গত ২০ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ৭৯তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে তাঁকে এ সম্মানে ভূষিত করা হয়।
পুরস্কার তুলে দেন ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধি সম্মেলনের সভাপতি ডা. ভিক্টর এলিয়াস আতাল্লাহ লাজাম। সঙ্গে ছিলেন ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ডা. টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস এবং গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব পুরস্কারে সমর্থন জোগানো বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই সম্মাননা পেয়ে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই স্বনামধন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।
নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ (এনটিডি), সর্পদংশন (স্নেকবাইট এনভেনোমিং) এবং ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের লড়াইয়ে তাঁর দীর্ঘ ও নীরব আত্মত্যাগেরই এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি এই পুরস্কার।
দেশে ‘এভিডেন্স বেইজড মেডিসিন’ প্র্যাকটিস ছড়িয়ে দিতে ১৯৯৯ সাল থেকে কাজ করছেন গবেষণা অন্তঃপ্রাণ অধ্যাপক ডা. আবুল ফায়েজ। সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএমইউ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সীমিত পরিসরে এর চর্চা শুরু হয়েছে।
প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা সেবায় বিএমইউ ২০২৫ সালের জন্য ওয়ার্ল্ড এভিডেন্স-বেইজড হেলথকেয়ার (ইবিএইচসি) ডে কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে এভিডেন্স অ্যাম্বাসেডর হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল ফায়েজ।
তিনি দেশে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার অন্তত দুই বছর আগেই এর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। সাপের কামড়ের চিকিৎসা ও বিষহীন সাপ না মেরে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টিরও পথপ্রদর্শক এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
অর্থ ও সামাজিক খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে গবেষণায় জীবন সঁপে দিয়েছিলেন এই ভীষণ বিনয়ী মানুষটি। এর কল্যাণেই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি পেলেন তিনি। তার এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মূলত দেশের চিকিৎসা ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হলো।
বেড়ে ওঠা ও কর্মজীবন
অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন, এরপর এফসিপিএস (এডিআইএন) এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ক্যাসল থেকে পিএইচডি করেন।
১৯৭৮ সালে তিনি ইন সার্ভিস ট্রেইনি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন।
অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ ১৯৭৮ সাল থেকে স্নেক বাইট, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, টিবি ও নিপাহ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
বিস্তৃত কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮-২০০৯ সালে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তাঁর লেখা একটি আর্টিকেল গ্লোবাল ম্যালেরিয়া রিসোর্স ‘ম্যালেরিয়া নেক্সাস’র ২০১৪ সালের পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় গবেষণাপত্রগুলোতে প্রকাশিত সেরা দশটি আর্টিকেলের মাঝে প্রথম হয়। এ ছাড়াও অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজের ম্যালেরিয়া রিসার্চ গ্রুপের একটি আর্টিকেল ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের ২০১০ সালের সেরা বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক আর্টিকেল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল।
আরও যারা পুরস্কৃত হলেন
অধ্যাপক ফায়েজের পাশাপাশি মালির বানকোনি কমিউনিটি হেলথ অ্যাসোসিয়েশন (আসাকোবা) কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রণী ভূমিকার জন্য সাসাকাওয়া স্বাস্থ্য পুরস্কার লাভ করে। থাইল্যান্ডের ডা. ওয়ারাওইত টন্টিওয়াত্তানাসাপ গ্রামীণ, রাষ্ট্রহীন ও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণে অবদানের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন পুরস্কার পান।
সুস্থ ও ভালোভাবে বার্ধক্যে পৌঁছাতে সহায়তা করার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য কুয়েত স্বাস্থ্য উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ‘শেখ সাবাহ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে দুই পক্ষকে। বয়স্ক মানুষের চিকিৎসা ও যত্নে নতুন ও উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করার জন্য পুরস্কার পেয়েছে ফ্রান্সের অধ্যাপক ব্রুনো ভেলাস এবং আর কমিউনিটির মানুষকে যুক্ত করে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে বয়স্কদের সুস্থ জীবন নিশ্চিতে অবদান রাখায় পুরস্কার পায় সিঙ্গাপুরের সিংহেলথ।
রোগ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং সমতা-ভিত্তিক প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেলসন ম্যান্ডেলা স্বাস্থ্য উন্নয়ন পুরস্কার লাভ করেন মিশরের ডা. আমর মোহাম্মদ কানদিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী বোর্ড গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিজয়ীদের নির্বাচন করে। সংস্থাটির ষষ্ঠ মহাপরিচালক ডা. লি জং-উকের মৃত্যুর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বছরের পুরস্কারগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সিকান্দার আবু সাইম