সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া অনেক সময়ই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। হাসপাতালে নিতে দেরি হলে বাড়ে মৃত্যুঝুঁকি।এমন বাস্তবতায় সড়কে আহতকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে পৌঁছে দিতে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে সমন্বিত দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা (পোস্ট-ক্র্যাশ রেসপন্স)। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট’-এর আওতায় জয়দেবপুর চৌরাস্তা-টাঙ্গাইল-রাজশাহী, জয়দেবপুর চৌরাস্তা-ময়মনসিংহ ও সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল-রংপুর করিডোরে পরীক্ষামূলকভাবে ১০ কিলোমিটার পরপর একটি করে মোট ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হবে। দুর্ঘটনার পর প্রথম ১ ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যে আহতকে চিকিৎসার আওতায় আনাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা আগামী মাসের শুরুতেই সেবাটি চালুর পরিকল্পনা করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।
জানা গেছে, পুরো সেবাটি পরিচালিত হবে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে জিপিএস ট্র্যাকার থাকবে। ফলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্সগুলোর অবস্থান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যাবে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে কাছের অ্যাম্বুলেন্সটি ঘটনাস্থলে পাঠানো হবে। প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে চালকের পাশাপাশি থাকবেন একজন প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তারা ঘটনাস্থলেই আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেবেন। এরপর দ্রুত নিকটস্থ উপযুক্ত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করবেন। ৬০টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে কয়েকটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেয়া হবে। দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক সহায়তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তাদের ফার্স্ট এইড বক্সও সরবরাহ করা হবে, যাতে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছার আগ পর্যন্ত আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু অ্যাম্বুলেন্স সেবা নয়; দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাসেবার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত জনবল ও দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে অনেক আহত ব্যক্তি দুর্ঘটনার প্রথম ১ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায় বা পঙ্গুত্বের শিকার হয়। নতুন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় কল সেন্টার, জিপিএস-ভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স ট্র্যাকিং, প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে দ্রুত সাড়া দেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা আগে ছিল না। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও একই ধরনের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
জরুরি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নিরাপদ করিডোরগুলোয় সড়কের নকশা উন্নয়ন, সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন, পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং গতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া হবে। ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশকে আধুনিক সরঞ্জাম দেয়া হবে। অতিরিক্ত গতিতে চলা ও অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান শনাক্তে চালু হবে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। মহাসড়কগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় এনে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব কার্যক্রমে সওজ, বিআরটিএ, পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
এসএএস
এসএএস