বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছে, তখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত ওষুধ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এলডিসি পরবর্তী সময়ে পেটেন্ট ছাড়ের সুবিধা উঠে গেলে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স এবং লাইসেন্সিং জটিলতায় ওষুধের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়তে পারে। এতে ক্যান্সারসহ জটিল রোগের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের ট্রিপস (ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) চুক্তির অধীনে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) হওয়ায় ওষুধের পেটেন্টে বিশেষ ছাড় পায়। এর ফলে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো অনেক পেটেন্টকৃত ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ কম খরচে তৈরি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করলে এই সুবিধা আর আগের মতো থাকবে না। বর্তমানে উত্তরণের নির্ধারিত সময় চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর পূর্ণ ট্রিপস নিয়ম মানতে হতে পারে।
বুধবার (১৩) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত ‘এলডিসি উত্তরণ প্রেক্ষাপটে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবন শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব আশঙ্কার কথা জানানো হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়াই অনেক জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করতে পারছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কম থাকছে এবং তুলনামূলক কম দামে ওষুধ বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এলডিসি সুবিধা শেষ হলে পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘নতুন পেটেন্টধারী ওষুধ উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স নিতে হবে, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানতে হবে এবং বায়োইকুইভ্যালেন্স ও বায়োসিমিলার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের এখনো সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে বিদেশে পরীক্ষা করাতে হবে, বাড়বে উৎপাদন ব্যয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ক্যানসার ও জটিল রোগের ওষুধে। এসব ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন খাত নিয়ে অধ্যাপক হামিদ বলেন, ‘২০১৮ সালের এপিআই নীতিমালায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় গড়ে ওঠা এপিআই শিল্পপার্কও এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচিউরিটি লেভেল–৩ অর্জনেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।’
বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএআইএমএ) সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান বলেন, ২০১৬ সালে এডিবির অধীনে এ বিষয়ে একটি গবেষণা হয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে নীতিমালাও করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে অগ্রগতি খুবই সীমিত। নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এই শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়বে। বিশেষ করে পেটেন্ট ছাড়, কমপ্লায়েন্স ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের বাধ্যবাধকতার কারণে ওষুধের দাম বাড়তে পারে এবং রপ্তানি সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, গবেষণা, বায়োটেকনোলজি ও এপিআই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। ড. তিতুমীর আরও বলেন, ইন্ডাস্ট্রি হবে প্রাইস টেকার, প্রাইস মেকার নয়। ওষুধ শিল্পে বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় না বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অধিকারভিত্তিক ও সর্বজনীন করতে চায়। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিবর্তে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা বলয় গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন ও শিল্প বাণিজ্যের দুর্বল পরিবেশ উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পড়েছে। আমরা একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেয়েছি কিন্তু একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে যেতে চাই।
সিকান্দার আবু সাইম